বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী (১৯৪৫–২০২৫)
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারপারসন যিনি ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান।
প্রথম জীবন ও পরিবার
বেগম জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আদি বাড়ি দেশের দক্ষিণ-পূর্ব জেলা ফেনীতে। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন।
জিয়াউর রহমান বীর উত্তম যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন, তখন বেগম জিয়া ফার্স্ট লেডি হিসেবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এবং নেদারল্যান্ডের রানি জুলিয়ানাসহ বিশ্বনেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
রাজনীতিতে প্রবেশ ও আপোষহীন নেত্রী
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাহাদাতের পর, তিনি ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগদান করেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি দলের ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানের পর খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সর্বাত্মক আন্দোলনের সূচনা করেন। তিনি ছিলেন ১৯৮৩ সালে গঠিত সাত দলীয় জোটের স্থপতি। তাঁর দৃঢ় সংকল্পের কারণে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তাঁকে সাতবার আটক করা হয়। এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কঠোর বিরোধিতার কারণে তিনি "আপোষহীন নেত্রী" হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বেগম জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তাঁর মেয়াদে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয়। কর্মসংস্থান ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়—শুধু তৈরি পোশাক খাতেই পাঁচ বছরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ছিল ২৯%, এবং প্রায় দুই লাখ নারী এই খাতে যোগ দেন।
তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানি-বণ্টনের সমস্যা উত্থাপন করেন। ১৯৯২ সালে হোয়াইট হাউসে তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সমস্যা তুলে ধরেন, যার ফলে পরবর্তীতে মিয়ানমারের সাথে প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়।
দ্বিতীয় মেয়াদ ও জোট রাজনীতি
১৯৯৬ সালে বিএনপির বিজয়ের পর খালেদা জিয়া টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় এক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেন। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে বিএনপি ১১৬টি আসন পেয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিরোধী দল হয়।
১৯৯৯ সালে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি চারদলীয় জোট গঠন করে এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জয়ী হন। ফোর্বস ম্যাগাজিন ২০০৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তাঁকে ২৯তম স্থান দেয়।
শিক্ষায় অবদান ও নির্বাচনী রেকর্ড
ক্ষমতায় থাকাকালীন খালেদা জিয়ার সরকার বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি এবং 'শিক্ষার জন্য খাদ্য' কর্মসূচি প্রবর্তন করে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করা হয় এবং শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বেগম জিয়া কোনো আসনে পরাজিত না হওয়ার অনন্য রেকর্ডের অধিকারী। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের নির্বাচনগুলোতে তিনি পাঁচটি পৃথক সংসদীয় আসনে নির্বাচিত হন এবং ২০০৮ সালে যে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সবগুলোতেই জয়ী হন।
গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম ও ইন্তেকাল
২০০৯ সাল থেকে যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশকে একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করে, তখন তিনি গণতন্ত্রের জন্য তাঁর লড়াই নতুন করে শুরু করেন। সরকার তাঁকে জোরপূর্বক বাড়ি থেকে বের করে দেয় এবং একাধিকবার গৃহবন্দী করে। গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর ভূমিকার জন্য ২০১১ সালে নিউ জার্সির স্টেট সিনেট তাঁকে "গণতন্ত্রের জন্য যোদ্ধা" উপাধিতে সম্মানিত করে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি'র চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ইং ইন্তেকাল করেন। কোটি মানুষের ভালোবাসায় তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।